ইতিহাস সময়ের এক দর্পন। এই দর্পনের সামনে দাঁড়িয়েই আমরা দেখি ঐতিহাসিক বাস্তবতা। বাংলার সমৃদ্ধ ইতিহাস ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে গোটা দেশে। কিশোরগঞ্জ হাওরের স্থানে স্থানেও রয়েছে সেই ইতিহাসের নানা নিদর্শন। জেলার মিঠামইন উপজেলার দিল্লির আখড়াও ঠিক এমনই এক ইতিহাসের নাম।
নাম শুনে অনেকেই হয়তো ভাববেন এই আখড়াটি ভারতের দিল্লির। অথবা ভাববেন দিল্লির সাথে কোন সম্পর্ক আছে। বাস্তবে বিষয়টি মোটেও এরকম নয়। দিল্লির আখড়া (Dhillir Akhra) বাংলার সাড়ে ৪শ বছরের পুরনো এক বৈষ্ণব আখড়া। মিঠাইমন উজেলার কাটখাল ইউনিয়নে দিল্লির আখড়া অবস্থিত।
জনশ্রুতি আছে দিল্লির সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে আধ্যাত্মিক সাধু নারায়ন গোস্বামী এই আখড়াটি স্থাপন করেন। তিনি শুধু আখড়াই স্থাপন করেননি। এর ভেতরে রয়েছে ধর্মশালা, নাটমন্দির, অতিথিশালা, পাকশালা। বৈষ্ণবদের থাকার জন্য ঘরও নির্মাণ করা হয় দিল্লির আখড়ায়। সাধক নারায়ন গোস্বামীসহ তার অন্যতম শিষ্য গঙ্গারাম গোস্বামীর সমাধি দেখা যায় আখড়াটিতে।
তার সময়ে অলৌকিকভাবে ৩ হাজার হিজল গাছ পেয়েছিলেন আখড়ার চারপাশে। রয়েছে দুটি পুকুর। হাওরের সৌন্দর্য বাড়িয়েছে নদীর অববাহিকায় অবস্থিত এই আখড়ার ও ছড়িয়ে থাকা হিজল গাছগুলো।
দিল্লীর আখড়ার ইতিহাস
দিল্লীর আখড়ার ইতিহাস খুবই প্রচলিত। এর বাস্তবতার বিশেষ কোন নথি পাওয়া যায় না। তবে মানুষের মুখে প্রচলিত অনেক হাড় হিম করা গল্প বাঁচিয়ে রেখেছে দিল্লীর আখড়াকে। জানা যায় সাধক নারায়ন গোস্বামী ছিলেন পার্শ্ববর্তী বিতলঙ্গের আখড়ার আধ্যাত্মিক সাধক রামকৃষ্ণ গোস্বামীর শিষ্য।
৪-৫শ বছর আগে মিঠামইনের বিস্তীর্ণ এই হাওরে অগণতি ঘন ঝোপ-জঙ্গলে পূর্ণ ছিলো। হাওর ছিলো নদীবেষ্টিত। দূরে দূরে কোথাও দ্বীপ গ্রামে ছিলো জনবতি। কোন এক অজানা কারণে নদীপথে গমনকারী নৌকাগুলো নির্দিষ্ট জায়গায় ডুবে যেতো অথবা কোন কোন নৌকা দুর্ঘটনার শিকার হতো।
এসব ঘটনার ধারাবাহিকতায় একদিন দিল্লির সম্রাটের একটি মালবোঝাই কোষা নৌকা নদীপথে যাত্রা করছিলো। যাত্রার এক পর্যায়ের বিতলঙ্গের পার্শ্ববর্তী নির্দিষ্ট জায়গায় কোষা নৌকাটি ডুবে যায়। নৌকার আরোহীরা অনেক চেষ্টার পরও নৌকাটি উদ্ধার করতে পারেনি। উপরন্তু তাদের একজন সঙ্গী সাপের কামড়ে মারা যান।
কোন উপায়ে বিতলঙ্গের সাধক রামকৃষ্ণ এ খবর পান। তিনি তার শিষ্য নারায়ণ গোস্বামীকে ঘটনাস্থলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। গুরুর নির্দেশে নারায়ণ গোস্বামী ঘটনাস্থলে যান। নদীর তীরে বসে ধ্যান, তপস্যা করে ঘটনা বুঝার চেষ্টা করেন।
আশ্চর্যের ঘটনা হলো কোন এক অদৃশ্য শক্তি তাকে হাত-পা বেধে নদীতে ফেলে দেয়। তার সাধনাবলে কোনরকম তিনি তীরে আসতে পারেন। এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয় ৭দিন। অষ্টম দিনও তিনি ধ্যানে বসলে এক দ্বৈব বাণী তাকে এই স্থান ত্যাগ করতে বলে।
তাতেও পিছপা হননি সাধক নারায়ণ গোস্বামী। উত্তরে তিনি তাদের পরিচয় জানতে চান, চান দরশন। দ্বৈব বাণী তাদের এখানকার বাসিন্দা পরিচয় দেন এবং মুহূর্তেই দানব আকার ধারণ করেন। গোস্বামী নিজ চোখে দেখলেন তার চারপাশে অগণিত দানবমূর্তি।
দানবদের সাথে বুঝাপড়া হয় গোস্বামীর। তারা সাধকের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নেন, তারা কোন দিন মানুষের ক্ষতি করবে না, মানুষও তাদের ক্ষতি করবে না। দানবেরা প্রতিশ্রুতি মেনে নিয়ে হাজার হাজার হিজল গাছে পরিণত হয়।
পরে সাধক তার ক্ষমতাবলে ডুবে যাওয়া কোষা নৌকা মালামালসহ উদ্ধার করেন। বাঁচিয়ে তোলেন সাপে দংশন করা মৃত ব্যক্তিকে। এ খবরে দিল্লির সম্রাট জাহাঙ্গীর মহাখুশি। সম্রাট খুশি হয়ে সাধক নারায়ণ গোস্বামীর জন্য একটি আখড় নির্মাণের ব্যবস্থা করে দেন। সেই থেকেই এই আখড়ার নাম দিল্লির আখড়া।
৩৭২ একর জায়গাজুড়ে নির্মিত এ আখড়ায় বছরের পর বছর সাধনা করেন গোস্বামী। তার সাধনার জায়গাটি আজও অম্লান, অক্ষত। পাকা বেস্টনীতে আবদ্ধ সেই তীর্থ আজও কালের সাক্ষী হয়ে আছে দিল্লির আখড়ার। প্রতি অমাবশ্যা ও পূর্ণিমার রাতে এস্থানে ভোগ দেয়া হয়। প্রতি বছর বাংলা চৈত্র মাসের ৮ তারিখ মেলার আয়োজন করা হয়।
যাতায়াত ও থাকার ব্যবস্থা
দিল্লির আখড়ায় যেতে বাংলাদেশের যে কোন জেলা থেকে কিশোরগঞ্জ, নিকলী অথবা বাজিতপুর উপজেলায় আসতে হবে। রাজধানী কমলাপুর থেকে সকাল ৭টা ও ১০:৩০ মিনিটে দুটি ট্রেন ছেড়ে আসে কিশোরগঞ্জের উদ্দেশ্যে। কিশোরগঞ্জ, নিকলী ও বাজিতপুর থেকে বর্ষা মৌসুমে সরাসরি দিল্লির আখড়া অথবা মিঠামইন হয়ে দিল্লির আখড়ায় যাওয়া যায়। শুকনো মৌসুমে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের বালিখোলা হয়ে সড়ক যোগাযোগে মিঠামইন যাওয়া যায়। পরে অটোরিক্সাতে দিল্লির আখড়ায় যাওয়া যাবে।
মিঠামইনে থাকার বিশেষ কোন ব্যবস্থা। নেই। সরকারি ডাকবাংলতে থাকতে আগে থেকেই বুকিং দিয়ে আসতে হয়। তবে শুক্র ও শনিবার বুকিং পাওয়া একটু জটিল। তবে দিনের আলো থাকতেই কিশোরগঞ্জ শহরে ফেরত যাওয়া সম্ভব। মিঠামইনে খাওয়ার জন্য অনেক রেস্টুরেন্ট আছে। তবে খাওয়ার জন্য তুলনামূলক কম বাজেট থাকলে দুপুরে হালকা কিছু খেয়ে নিলে কিশোরগঞ্জ শহরে গিয়েও খাওয়া যায়। কাটখাল বাজারে কোন রেস্টুরেন্ট থাকলে সেখানে কম খরচে খাবারও পাওয়ার আশা করা যেতে পারে।
















